একটা সাইট আমরা অডিট করেছিলাম যেখানে তিন মাসে এক হাজারের বেশি ব্লগ পোস্ট প্রকাশ হয়েছিল। খুলে দেখা গেল প্রতিটা পোস্ট একই ছাঁচে ঢালা — একই হেডিং, একই বাক্য, শুধু বিষয়ের নামটা বদলানো। ‘গ্রাফিক ডিজাইন কেন গুরুত্বপূর্ণ’-র জায়গায় ‘ভিডিও এডিটিং কেন গুরুত্বপূর্ণ’। প্রথম ছয় সপ্তাহ ইমপ্রেশন বাড়ল, দেখে মনে হলো কৌশলটা কাজ করছে। তারপর একটা কোর আপডেটে গোটা ডোমেইনের সার্চ ট্রাফিক ধসে পড়ল, এবং যে পেজগুলো আসলে ভালো ছিল সেগুলোও সঙ্গে ডুবল।
এই ঘটনার শিক্ষাটা ‘AI দিয়ে লিখো না’ নয়। Google-এর স্প্যাম পলিসিতে ২০২৪ সাল থেকে যে জিনিসটার নাম দেওয়া হয়েছে scaled content abuse, সেটার সংজ্ঞা খেয়াল করুন — সার্চ র্যাংকিং ম্যানিপুলেট করার জন্য বিপুল পরিমাণে কনটেন্ট তৈরি, যা পাঠকের কোনো কাজে আসে না। এখানে ‘AI দিয়ে তৈরি’ কথাটা নেই। Google বারবার বলেছে, তারা কনটেন্ট কীভাবে বানানো হলো তা দেখে না, কনটেন্টটা কেমন হলো তা দেখে। মানুষের হাতে লেখা এক হাজার অকেজো পোস্টও ঠিক একইভাবে শাস্তি পেত।
তাহলে আসল প্রশ্নটা ‘AI ব্যবহার করব কি না’ নয়। প্রশ্নটা হলো — কোন কাজটা AI-কে দেব, কোনটা কিছুতেই দেব না, আর মাঝখানের ধূসর জায়গাটা কীভাবে সামলাব।
যে চারভাবে আজকাল কনটেন্ট লেখা হচ্ছে
- ক. সম্পূর্ণ মানুষ। রিসার্চ, আউটলাইন, ড্রাফট, এডিট — সব হাতে। ১,২০০ শব্দের একটা লেখায় ভালো রাইটারের লাগে ৩–৫ ঘণ্টা। বাংলাদেশে ভালো ইংরেজি ব্লগ পোস্টের বাজারদর ৳৮০০–২,০০০।
- খ. AI ড্রাফট, মানুষ এডিট। প্রম্পট দিয়ে ড্রাফট নিয়ে তারপর ঠিক করা। সময় ৪৫–৯০ মিনিট। ফাঁদ হলো, খারাপ ড্রাফট এডিট করতে অনেক সময় নিজে লেখার চেয়ে বেশি সময় লাগে।
- গ. হাইব্রিড। মানুষ রিসার্চ ও আউটলাইন করে, AI সেকশন ধরে ধরে ড্রাফট করে (নিজের স্মৃতি থেকে নয়, আপনার দেওয়া নোট থেকে), তারপর মানুষ আবার লেখে। সময় ৯০ মিনিট–২ ঘণ্টা, কিন্তু মান ধরে রাখা যায়।
- ঘ. বাল্ক জেনারেশন। এক টেমপ্লেটে শত শত পোস্ট। খরচ প্রায় শূন্য, সময় ছয় মিনিট। আর ঠিক সেই কারণেই এর কোনো দাম নেই — যা যে কেউ ছয় মিনিটে বানাতে পারে, সেটা Google-এর কাছেও মূল্যহীন।
খরচের হিসাবটা যেভাবে সবাই ভুল করে
ChatGPT Plus বা Claude Pro-র মাসিক ২০ ডলার মানে ৳২,৪০০-র মতো। এর বিপরীতে একজন মানুষ রাইটারের একটা পোস্টের দাম ৳১,৫০০। খাতায় দেখলে AI জিতে যাচ্ছে বিশাল ব্যবধানে। কিন্তু হিসাবের বাইরে থেকে যায় তিনটা খরচ, আর ওখানেই আসল টাকা যায়।
প্রথমত, ফ্যাক্ট-চেক। AI আত্মবিশ্বাসের সাথে ভুল সংখ্যা লেখে — ভুল দাম, ভুল সাল, এমন ফিচার যা টুলটাতে নেইই। ক্লায়েন্টের ব্লগে একটা ভুল দাম ছাপা হলে সেটা ঠিক করার খরচ পোস্টটার আয়ের চেয়ে বেশি। দ্বিতীয়ত, ক্লিনআপ বিল — ছয় মাস পর যখন বুঝবেন দুইশ পাতলা পোস্ট আপনার ডোমেইনকে টেনে নামাচ্ছে, তখন সেগুলো মুছে বা রিরাইট করে ঠিক করতে যে সময় যাবে, সেটাই সবচেয়ে বড় খরচ। তৃতীয়ত, সুযোগ খরচ — ওই একই সময়ে দশটা গভীর, সত্যিকারের কাজের পোস্ট লিখলে যে ফল আসত, সেটা আর পাওয়া যাবে না।
বাংলায় AI লেখার আসল সমস্যা
এই অংশটা ইংরেজি ব্লগে পাবেন না, অথচ আমাদের জন্য এটাই সবচেয়ে জরুরি। বড় মডেলগুলো বাংলা লিখতে পারে, ব্যাকরণও মোটামুটি শুদ্ধ থাকে — কিন্তু জিনিসটা পড়তে অনুবাদের মতো লাগে। কারণ মডেলটা ভেতরে ভেতরে ইংরেজিতে ভাবছে, তারপর বাংলা শব্দ বসাচ্ছে। ফল হলো ইংরেজি বাক্যগঠনের ওপর বাংলা শব্দের প্রলেপ — যাকে আমরা বলি ‘অনুবাদগন্ধী বাংলা’।
লক্ষণগুলো চেনা সহজ: প্রতি অনুচ্ছেদে ‘এটি একটি’ দিয়ে বাক্য শুরু, অকারণে ‘যা’ আর ‘উক্ত’-র ছড়াছড়ি, সব জায়গায় কর্মবাচ্য, আর ‘পরিশেষে বলা যায় যে’ দিয়ে শেষ করা। কেউ এভাবে কথা বলে না, কেউ এভাবে পড়তেও চায় না।
- ব্রিফটা বাংলায় লিখুন, ইংরেজিতে নয়। ইংরেজি প্রম্পট দিলে আউটপুট অনুবাদই হবে — মডেল আপনার ভাষার সুরটা তখন ইংরেজি থেকে ধার করে।
- AI-কে প্রথম বাংলা ড্রাফট লিখতে দেবেন না। বরং আপনি রুক্ষ বাংলা ড্রাফট লিখুন, AI-কে বলুন সেটাকে টাইট করতে, পুনরাবৃত্তি কাটতে। এডিটর হিসেবে বাংলায় AI অনেক ভালো, লেখক হিসেবে দুর্বল।
- নিষিদ্ধ শব্দের তালিকা দিন। প্রম্পটে সরাসরি লিখে দিন: ‘এটি একটি’, ‘উপরন্তু’, ‘পরিশেষে বলা যায়’ — এগুলো ব্যবহার করা যাবে না। ফলাফলে তাৎক্ষণিক পার্থক্য দেখবেন।
- নাম, দাম, সংখ্যা — সব হাতে যাচাই করুন। bKash-এর চার্জ, Daraz-এর কমিশন, ডোমেইনের দাম — এসব AI প্রায়ই দুই বছর পুরোনো বা সরাসরি বানানো তথ্য দেয়।
একটা সহজ পরীক্ষা: লেখাটা কাউকে ফোনে জোরে পড়ে শোনান। বাংলা লেখা কানে ধরা পড়ে যেভাবে, চোখে সেভাবে ধরা পড়ে না। অস্বস্তি লাগলেই বুঝবেন বাক্যটা অনুবাদ।
কোন কাজ AI-কে নির্দ্বিধায় দিতে পারেন
- মেটা ডেসক্রিপশন ও টাইটেলের বিশটা ভ্যারিয়েশন — আপনি বেছে নেবেন। এখানে AI-র গতি খাঁটি লাভ।
- সাপোর্ট টিকেট বা WhatsApp চ্যাট থেকে সত্যিকারের প্রশ্ন নিয়ে FAQ সেকশন গোছানো। প্রশ্নগুলো বাস্তব, শুধু গোছানোর কাজটা AI-র।
- আপনার নিজের শেষ করা লেখার প্রথম খসড়া অনুবাদ — যেটা পরে আপনি হাতে ঠিক করবেন। শূন্য থেকে অনুবাদের চেয়ে এটা অনেক নিরাপদ।
- ইন্টারভিউ বা মিটিং ট্রান্সক্রিপ্ট থেকে সারসংক্ষেপ, আর একটা কেস স্টাডিকে সোশ্যাল পোস্টে ভাঙা।
কোন কাজ কখনোই AI-কে দেবেন না
- নিজের অভিজ্ঞতার গল্প। আপনার প্রজেক্টে কী ভুল হয়েছিল, ক্লায়েন্ট কী বলেছিলেন — এটাই একমাত্র জিনিস যা প্রতিযোগী কপি করতে পারে না, এবং AI-র কাছে এর কোনো উৎসই নেই।
- স্বাস্থ্য, আইন, বিনিয়োগ বা ওষুধ সংক্রান্ত পরামর্শ। এখানে একটা ভুল বাক্যের মূল্য কারও ক্ষতি — র্যাংকিং তো পরের কথা।
- মতামত ও অবস্থান। ‘আমরা কেন Elementor ছেড়ে দিয়েছি’ ধরনের লেখা AI লিখলে সেটা নিরপেক্ষ, দ্বিধাগ্রস্ত আর মেরুদণ্ডহীন হবে — অর্থাৎ পড়ার অযোগ্য।
- যেসব সংখ্যা আপনি যাচাই করতে পারবেন না। যাচাই করতে না পারলে সংখ্যাটা বাদ দিন, বানানো সংখ্যা বসানোর চেয়ে সেটা ভালো।
সিদ্ধান্তের নিয়ম: কোন কাজে কোন পদ্ধতি
- সম্পূর্ণ নিজে লিখুন যখন কনটেন্টটাই আপনার পণ্য — এজেন্সির কেস স্টাডি, ফাউন্ডারের মতামত, সেলস ইমেইল, ল্যান্ডিং পেজের কপি। এগুলোতে আপনার কণ্ঠস্বরটাই বিক্রি হচ্ছে।
- AI ড্রাফট + মানুষ এডিট বেছে নিন যখন বিষয়টা আপনি ভালো জানেন, শুধু বসে লেখার সময় নেই। শর্ত: আপনাকে বিষয়টা জানতেই হবে, নইলে ভুল ধরবেন কীভাবে?
- হাইব্রিড বেছে নিন যখন মাসে আট থেকে পনেরোটা পোস্ট দরকার এবং বিষয়গুলো রিসার্চনির্ভর। এটাই বেশিরভাগ ব্যবসার জন্য টেকসই মধ্যপন্থা।
- বাল্ক জেনারেশন বেছে নেবেন না — কখনোই না, অন্তত এমন কোনো পেজে নয় যেটা Google ইনডেক্স করবে। ইনডেক্স হওয়া পাতলা পেজ সম্পদ নয়, দায়।
আমাদের পরামর্শ: হাইব্রিড, তবে একটা শর্তে
আমাদের নিজেদের নিয়মটা সহজ, এবং এটাই আমরা ক্লায়েন্টদের দিই — প্রতিটা পোস্টে অন্তত একটা এমন জিনিস থাকতে হবে যা ইন্টারনেটের আর কোথাও নেই। একটা স্ক্রিনশট, একটা আসল দামের হিসাব, একটা ক্লায়েন্টের গল্প, একটা টুল আসলে যেভাবে ভেঙে যায় তার বর্ণনা। এই ‘একটা মৌলিক জিনিস’ না থাকলে পোস্টটা প্রকাশ করবেন না — AI লিখুক বা মানুষ, তাতে কিছু আসে-যায় না। কারণ ওই একটা জিনিসই আপনার পোস্টকে বাকি দশ হাজার পোস্ট থেকে আলাদা করে।
ওয়ার্কফ্লোটা দাঁড়ায় এরকম: প্রথমে সত্যিকারের উপাদান জোগাড় (নিজের ডেটা, স্ক্রিনশট, ক্লায়েন্টের সাথে দশ মিনিটের কল), তারপর হাতে আউটলাইন, তারপর AI-কে আপনার নোট দিয়ে সেকশন ড্রাফট করতে বলা, তারপর শুরু ও শেষের অংশটা পুরোপুরি নিজের হাতে লেখা (পাঠক ওখানেই সিদ্ধান্ত নেন), তারপর প্রতিটা সংখ্যা যাচাই, সবশেষে জোরে পড়ে দেখা। মোট সময় দেড় ঘণ্টা — সম্পূর্ণ হাতে লেখার অর্ধেক, আর বাল্ক জেনারেশনের চেয়ে হাজার গুণ নিরাপদ।
প্রায়ই যে প্রশ্নগুলো আসে
Google কি বুঝতে পারে লেখাটা AI-তে লেখা? ভুল প্রশ্ন। Google-এর ঘোষিত অবস্থান হলো তারা উৎপাদনপদ্ধতি নয়, মান বিচার করে। তারা যেটা সত্যিই ধরে ফেলে তা হলো পাতলা, পুনরাবৃত্তিমূলক, একই ছাঁচে ঢালা কনটেন্ট — সেটা AI বানাক বা কম পয়সায় ভাড়া করা মানুষ। ভয়টা ‘ধরা পড়া’ নিয়ে নয়, ‘মূল্যহীন হওয়া’ নিয়ে রাখুন।
AI ডিটেক্টর দিয়ে চেক করা উচিত? ভরসা করার মতো নয়। এই টুলগুলো নিয়মিত মানুষের সাদামাটা, পরিচ্ছন্ন লেখাকে AI বলে চিহ্নিত করে, বিশেষ করে যাঁদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয় তাঁদের লেখায়। সর্বোচ্চ একটা ‘গন্ধ পরীক্ষা’ হিসেবে চালাতে পারেন, নীতি বানাবেন না।
বাংলা SEO-তে AI কনটেন্ট কি কাজ করে? স্বল্পমেয়াদে — হ্যাঁ, এবং সেটাই ফাঁদ। বাংলা SERP-এ প্রতিযোগিতা কম, তাই দুর্বল কনটেন্টও দ্রুত র্যাংক করে ফেলে। কিন্তু ওই একই কারণে একটা মানসম্মত, সত্যিকারের কাজের বাংলা লেখা লিখলে আপনি অনেক সহজে টেকসইভাবে জিতবেন। প্রতিযোগিতা কম থাকা মানে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নয়, ভালো করার সুযোগ।
কোন টুলটা সবচেয়ে ভালো? টুলের পার্থক্য ব্রিফের পার্থক্যের চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ। মোটা দাগে: লম্বা লেখা আর বাংলা এডিটিংয়ে Claude ভালো, দ্রুত ব্রেইনস্টর্ম ও ভ্যারিয়েশনে ChatGPT, আর টাটকা তথ্যের সাথে যাচাইয়ের জন্য সার্চ-যুক্ত মডেল। একটা দুর্বল ব্রিফ দিয়ে সেরা মডেল চালালেও দুর্বল লেখাই পাবেন।
AI কনটেন্ট রাইটিং নিয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার — এটা লেখকের বিকল্প নয়, লেখকের গতি বাড়ানোর যন্ত্র। আপনার ব্লগ বা ই-কমার্স সাইটের জন্য একটা কনটেন্ট ওয়ার্কফ্লো দাঁড় করাতে চাইলে Stack Alix-এর সাথে কথা বলুন; আমরা এমনভাবে সাজাই যাতে ছয় মাস পর সব মুছে ফেলতে না হয়।

