গত কয়েক বছরে আমাদের কাছে যত ল্যান্ডিং পেজ ঠিক করার কাজ এসেছে, তার বেশিরভাগেরই সমস্যা ছিল না ডিজাইনার খারাপ বলে। পেজগুলো দেখতে ঝকঝকে — বড় হিরো ইমেজ, ছয় ছবির স্লাইডার, ফেড-ইন অ্যানিমেশন, দামি ফন্ট। কিন্তু ফেসবুক অ্যাড থেকে চার হাজার ক্লিক ঢুকে অর্ডার এসেছে বিশ-পঁচিশটা। মালিক ভাবছেন অ্যাডের বাজেট বাড়াতে হবে, ডিজাইনার ভাবছেন আরও একটা অ্যানিমেশন দরকার। আসল সমস্যা এই দুটোর কোনোটাই নয় — সমস্যা কিছু ভুল ধারণায়, যেগুলো বাংলাদেশের ছোট-মাঝারি ব্যবসা আর ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে এতটাই চালু যে কেউ আর প্রশ্নই তোলে না।
নিচে ছয়টা ধারণা নিয়ে কথা বলছি। প্রতিটার বেলায় দেখাব কেন সেটা ভুল, আর তার বদলে কী করলে ল্যান্ডিং পেজ থেকে টাকা আসে। কোনো মোটিভেশনাল বকবক নয় — নম্বর, উদাহরণ আর হাতে-কলমে করা যায় এমন নিয়ম।
ভুল ধারণা ১ — দেখতে সুন্দর হলে বিক্রি এমনিতেই হবে
ডিজাইন অ্যাওয়ার্ড আর বিক্রির রশিদ দুটো আলাদা জিনিস। একজন ভিজিটর পেজে ঢুকে প্রথম পাঁচ সেকেন্ডে চারটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজে — এটা কী, আমার জন্য কি না, দাম কত, আর এখন আমাকে কী করতে হবে। এই চারটার উত্তর যদি স্ক্রল না করেই পরিষ্কার না হয়, তাহলে ফন্ট যত সুন্দরই হোক, লোকটা ব্যাক বাটনে চাপ দেবে। আর ফেসবুক অ্যাড থেকে আসা ট্রাফিকের ধৈর্য আরও কম — সে আপনাকে খুঁজে আসেনি, স্ক্রল করতে করতে থেমেছে মাত্র।
একটা উদাহরণ দিই। ধরুন একটা হোম-ডেকর ব্র্যান্ডের হেডলাইন — আপনার স্বপ্নের ঘর, আপনার মনের মতো। শুনতে দারুণ, কিন্তু এটা শূন্য তথ্য দেয়। এর বদলে যদি লেখা থাকে — হাতে বোনা বেতের চেয়ার, ঢাকার ভেতরে ৩ দিনে ডেলিভারি, দাম ৳৩,২০০ থেকে — তাহলে ভিজিটর সঙ্গে সঙ্গে জানে পণ্যটা কী, কত পড়বে, আর কবে হাতে পাবে। একটা পিক্সেলও না বদলে শুধু হেডলাইন আর সাব-হেডলাইনের এই পরিবর্তন সাধারণত নতুন ইলাস্ট্রেশন কেনার চেয়ে অনেক বেশি কাজে দেয়।
নিয়ম: হেডলাইনে পণ্য বা সেবার নাম, একটা কংক্রিট সুবিধা, আর দাম বা সময়সীমা — এই তিনটার অন্তত দুটো থাকতেই হবে। কবিতা লেখার জায়গা এটা নয়।
ভুল ধারণা ২ — কেউ স্ক্রল করে না, তাই সব ফোল্ডের উপরে চাপাতে হবে
এই ধারণাটা এসেছে খবরের কাগজের যুগ থেকে, আর ওয়েবে এসে আটকে গেছে। বাস্তবে মোবাইলে স্ক্রল করা এত স্বাভাবিক যে মানুষ পেজ পুরোপুরি লোড হওয়ার আগেই বুড়ো আঙুল নাড়ায়। কেউ স্ক্রল না করলে তার কারণ পেজ লম্বা নয় — কারণ উপরের অংশ তাকে নিচে নামার কোনো কারণ দেয়নি। উল্টো দিকে, সব কিছু উপরে চাপালে হিরো সেকশনে চারটা বাটন, একটা ডিসকাউন্ট ব্যাজ, একটা স্লাইডার আর একটা পপআপ — এত ভিড় হয় যে কোনোটাই আর চোখে পড়ে না।
অনুমান না করে দেখে নিন। Microsoft Clarity একদম ফ্রি, বসাতে দশ মিনিট লাগে, আর এটা স্ক্রল-ডেপথ ম্যাপ আর সেশন রেকর্ডিং দুটোই দেয়। যদি দেখেন ভিজিটরদের ৬০ শতাংশ পেজের মাঝামাঝি পর্যন্ত নামছে, তাহলে লম্বা পেজ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আর যদি ২০ শতাংশও না নামে, তখন প্রশ্নটা হবে — উপরের অংশে কোন সন্দেহটা মিটল না? ফোল্ডের উপরে আসলে মাত্র কয়েকটা জিনিস দরকার।
- একটাই পরিষ্কার হেডলাইন: কী বিক্রি হচ্ছে আর কার জন্য
- একটা প্রমাণ: রিভিউর সংখ্যা, ডেলিভারি করা অর্ডারের সংখ্যা, বা চেনা ক্লায়েন্টের নাম
- একটাই প্রাইমারি বাটন, যার লেখায় কাজটা বোঝা যায় — ৳২৯৯-এ কিনুন, বা হোয়াটসঅ্যাপে অর্ডার করুন
- পণ্যের আসল ছবি, স্টক ফটো নয়। বাংলাদেশি ক্রেতা বিদেশি মডেলের হাসিমুখ দেখে আর ভরসা পান না
ভুল ধারণা ৩ — যত বেশি অপশন দেব, তত বেশি মানুষ কিনবে
একটা ল্যান্ডিং পেজ, একটাই সিদ্ধান্ত। অথচ আমরা যা দেখি: একই পেজে তিনটা প্যাকেজ, উপরে পুরো নেভিগেশন মেনু, ডানে নিউজলেটার পপআপ, নিচে ফেসবুক চ্যাট বাবল, পাশে ফোন নম্বর, আর মাঝখানে একটা ভিডিও। ভিজিটর কিছুই বেছে নিতে পারে না, তাই কিছুই করে না। ল্যান্ডিং পেজ থেকে নেভিগেশন মেনু সরিয়ে দিলে অনেক সময় বিক্রি বাড়ে, কারণ বেরিয়ে যাওয়ার দরজাগুলো বন্ধ হয়। প্যাকেজ দেখাতেই হলে তিনটার বেশি নয়, একটাকে স্পষ্ট করে সবচেয়ে জনপ্রিয় বলে চিহ্নিত করুন, আর প্রতিটার পার্থক্য এক লাইনে লিখুন। মনে রাখবেন, দারাজে ক্রেতা বিভিন্ন সেলারের মধ্যে তুলনা করে; আপনার ল্যান্ডিং পেজকে নিজের সঙ্গে নিজের তুলনার টেবিল বানিয়ে ফেলবেন না।
ভুল ধারণা ৪ — স্পিড ডেভেলপারের সমস্যা, ডিজাইনের নয়
বাংলাদেশে ওয়েব ট্রাফিকের সিংহভাগ আসে মোবাইল থেকে, আর তার বড় অংশ মোবাইল ডেটায় — অফিসের ফাইবার লাইনে নয়। এখন ভাবুন, পেজ ভারী হয় কীসে? ছয় ছবির স্লাইডার, তিনটা ওয়েব ফন্ট, ফুল-উইড্থ অটোপ্লে ভিডিও, আর এলিমেন্টরে বসানো বারোটা উইজেট। এর প্রতিটাই ডিজাইনের সিদ্ধান্ত, ডেভেলপারের নয়। ডেভেলপার শুধু আপনার সিদ্ধান্তটা বাস্তবায়ন করেছেন। কয়েকটা সীমা নিজে থেকেই ঠিক করে নিন।
- হিরো ইমেজ WebP ফরম্যাটে, ১৫০ কিলোবাইটের নিচে; স্লাইডারের বদলে একটাই স্থির ছবি
- সর্বোচ্চ দুটি ফন্ট ফ্যামিলি; বাংলার জন্য একটা নরমাল ওজন আর একটা বোল্ডই যথেষ্ট
- গুগলের ভালো মাপকাঠি মেনে চলুন: LCP ২.৫ সেকেন্ডের নিচে, INP ২০০ মিলিসেকেন্ডের নিচে, CLS ০.১-এর নিচে
- অটোপ্লে ভিডিওর বদলে থাম্বনেইল রাখুন; ক্লিক করলে তবেই ইউটিউব এম্বেড লোড হবে
PageSpeed Insights-এ মোবাইল ট্যাবে পরীক্ষা করুন, তারপর নিজের ফোনে ওয়াইফাই বন্ধ করে মোবাইল ডেটায় পেজটা খুলে ঘড়ি ধরুন। হিরো ইমেজ আসতে যদি পাঁচ সেকেন্ড লাগে, তাহলে ওই ক্লিকের পেছনে খরচ করা অ্যাডের টাকাটা আপনি এমনিতেই হারালেন — ভিজিটর কনটেন্ট দেখার আগেই চলে গেছে।
ভুল ধারণা ৫ — বাটনের রং লাল করলেই কনভার্সন ২০% বাড়বে
এই গল্পটা ইন্টারনেটে অমর, তাই অঙ্কটা একবার করে ফেলা যাক। ধরুন আপনার এখনকার কনভার্সন রেট ২ শতাংশ, আর আপনি জানতে চান রং বদলে সেটা ২.৫ শতাংশ হলো কি না। ৯৫ শতাংশ কনফিডেন্স আর ৮০ শতাংশ পাওয়ার নিয়ে এই পার্থক্য বিশ্বাসযোগ্যভাবে ধরতে প্রতি ভ্যারিয়েন্টে দরকার প্রায় ১২,৫০০ ভিজিটর — দুই ভ্যারিয়েন্ট মিলিয়ে পঁচিশ হাজার। বাংলাদেশের বেশিরভাগ এসএমই ল্যান্ডিং পেজে মাসে তিনশো থেকে দেড় হাজার ভিজিটর আসে। ওই ট্রাফিকে বাটনের রঙের টেস্ট করলে আপনি ফলাফল মাপছেন না, নয়েজ মাপছেন।
ছোট ট্রাফিকে বড় জিনিস বদলাতে হয়, কারণ বড় পরিবর্তনের প্রভাবও বড় — কম ভিজিটরেই সেটা চোখে পড়ে। অফার বদলান (১০% ছাড়ের বদলে ফ্রি ডেলিভারি), হেডলাইন বদলান, দাম দেখানোর ধরন বদলান (৳৩,৬০০ একবারে, নাকি মাসে ৳৩০০), ফর্ম ছোট করুন, ক্যাশ অন ডেলিভারির লাইনটা যোগ করুন। রঙের একটাই সত্যিকারের ভূমিকা আছে — কনট্রাস্ট। বাটনটাকে পেজের সবচেয়ে বেশি কনট্রাস্টওয়ালা জিনিস হতে হবে, তা সে যে রঙই হোক।
ভুল ধারণা ৬ — ফর্মে যত বেশি ফিল্ড, লিড তত কোয়ালিফাইড
মোবাইল কিবোর্ডে প্রতিটা বাড়তি ফিল্ড একেকটা ছোট বাধা। আর বাংলাদেশে বাস্তবতা হলো, ক্রেতা ইমেইলের চেয়ে ফোন নম্বর অনেক সহজে দেন — অনেকে ইমেইল রোজ চেকই করেন না, কিন্তু ফোন সারাক্ষণ হাতে। তাই লিড ফর্মে নাম আর ফোন নম্বরই যথেষ্ট। ঠিকানা চান চেকআউটে, আর সেটাও একটা লম্বা টেক্সটবক্সে নয় — বিভাগ, শহর আর এলাকা আলাদা ড্রপডাউনে। Baymard-এর গবেষণা বলছে গড় চেকআউটে বারোটার কাছাকাছি ফিল্ড থাকে, যেখানে আটটাতেই কাজ চলে যায়।
- ইমেইল বাধ্যতামূলক করবেন না; ফোন নম্বরই যথেষ্ট, ইমেইল ঐচ্ছিক রাখুন
- ফোন ফিল্ডে type=tel সেট করুন, যাতে মোবাইলে সরাসরি নম্বর কিবোর্ড আসে
- ক্যাপচা এড়িয়ে চলুন; স্প্যাম ঠেকাতে একটা লুকানো হানিপট ফিল্ডই সাধারণত যথেষ্ট
- সাবমিটের পর ধন্যবাদ পেজে পরের ধাপটা বলুন: কখন কল করবেন, কোন নম্বর থেকে, আর পেমেন্টে bKash না ক্যাশ অন ডেলিভারি চলবে
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: ল্যান্ডিং পেজ কত লম্বা হওয়া উচিত? উত্তর: দাম আর ঝুঁকি যত বেশি, পেজ তত লম্বা। ৳৪৯৯-এর পণ্যের জন্য ছোট পেজই চলে। ৳৫০,০০০-এর সার্ভিস বা কোর্স হলে ভিজিটরের সব সন্দেহ মেটাতে হবে — রিফান্ড নীতি, আগের কাজের নমুনা, প্রশ্নোত্তর, সবই দরকার। লম্বা পেজ খারাপ নয়, অপ্রয়োজনীয় পেজ খারাপ।
প্রশ্ন: হোমপেজকেই ল্যান্ডিং পেজ বানালে সমস্যা কী? উত্তর: হোমপেজ তৈরি হয় সবার জন্য — সেখানে মেনু, ব্লগ লিংক, ক্যারিয়ার পেজ সব থাকে। ল্যান্ডিং পেজ তৈরি হয় একটা নির্দিষ্ট অ্যাড আর একটা নির্দিষ্ট অফারের জন্য। অ্যাডে যে কথা আর ছবি দেখে মানুষ ক্লিক করেছে, পেজের প্রথম স্ক্রিনে হুবহু সেই কথা আর সেই ছবিই থাকতে হবে।
প্রশ্ন: bKash বা Nagad-এর লোগো বসালে কি সত্যিই বিশ্বাস বাড়ে? উত্তর: লোগো নয়, স্পষ্ট তথ্য বিশ্বাস বাড়ায়। কোন পেমেন্ট মাধ্যম চলে, ক্যাশ অন ডেলিভারি আছে কি না, রিটার্ন পলিসি কী, আর কোন নম্বরে কথা বলা যাবে — এই চারটা লেখা থাকলে যেকোনো ব্যাজের চেয়ে বেশি কাজ হয়।
প্রশ্ন: কনভার্সন রেট কত হলে ভালো ধরব? উত্তর: শিল্পভেদে পার্থক্য বিশাল, তাই বাইরের বেঞ্চমার্কের পেছনে না ছুটে নিজের গত মাসের সংখ্যাটাকেই বেঞ্চমার্ক ধরুন। কোল্ড ফেসবুক ট্রাফিকে ই-কমার্সে ১ থেকে ৩ শতাংশ সাধারণ ব্যাপার; লিড ফর্মে ৫ থেকে ১৫ শতাংশও হতে পারে। আসল প্রশ্ন একটাই — এই মাসে গতমাসের চেয়ে ভালো করলেন কি না।
ল্যান্ডিং পেজ বানানো এক কাজ, আর সেটা সত্যিই বিক্রি করছে কি না তা মেপে ঠিক করা আরেক কাজ। স্ট্যাক অ্যালিক্সে আমরা দুটোই করি — নতুন পেজ ডিজাইন থেকে শুরু করে পুরোনো পেজের স্পিড, কপি আর ফর্ম ঠিক করা পর্যন্ত। আপনার পেজটা যদি ট্রাফিক পেয়েও অর্ডার না দেয়, লিংকটা আমাদের পাঠান — টাকাটা ঠিক কোথায় পড়ে যাচ্ছে, সেটা দেখিয়ে দেওয়া যাবে।

