WooCommerce সেটআপ নিয়ে বেশিরভাগ টিউটোরিয়াল যেখানে শেষ হয়, বাংলাদেশে আসল কাজটা শুরু হয় ঠিক সেখান থেকে। প্লাগইন ইনস্টল করে পণ্য যোগ করা পনেরো মিনিটের ব্যাপার — ইউটিউব সেটাই দেখায়। কিন্তু বিকাশে টাকা নেওয়া, ক্যাশ অন ডেলিভারির ভুয়া অর্ডার সামলানো, স্টেডফাস্টে পার্সেল বুক করা আর ঢাকার বাইরের ডেলিভারি চার্জ ঠিকঠাক বসানো — এই জিনিসগুলোর কোনোটাই ওই পনেরো মিনিটে নেই, অথচ দোকান চলবে কি না সেটা এগুলোর ওপরেই নির্ভর করে।
নিচের পরিকল্পনাটা পাঁচ সপ্তাহের। ধরে নিচ্ছি আপনি ফেসবুক পেজে বিক্রি করছেন, এখন নিজের সাইট চান, আর দিনে দুই-তিন ঘণ্টা সময় দিতে পারবেন। প্রতিটা সপ্তাহের শেষে একটা নির্দিষ্ট জিনিস কাজ করবে — চোখে দেখা যাবে, হাতে ধরা যাবে। ছয় সপ্তাহ ধরে সেটিংস ঘাঁটতে থাকা আর কখনো লঞ্চ না করা, এটাই সবচেয়ে সাধারণ পরিণতি, আর সেটা এড়ানোই এই ছকের মূল উদ্দেশ্য।
সপ্তাহ ১ — যে তিনটা সিদ্ধান্ত পরে বদলানো কঠিন
হোস্টিং, ডোমেইন আর থিম — এই তিনটা ভুল হলে ছয় মাস পরে পুরো সাইট আবার বানাতে হয়। হোস্টিং দিয়ে শুরু করুন। মাসে দেড়শ টাকার শেয়ার্ড প্যাকেজে WooCommerce চলে না; ওটা ব্লগের জন্য। ন্যূনতম লক্ষ্য রাখুন লাইটস্পিড সার্ভার, PHP ৮.১ বা তার ওপরে, আর অন্তত ২ জিবি র্যাম। দেশি ভালো হোস্টে বছরে সাধারণত ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা পড়ে, আর হোস্টিংগার বা ক্লাউডওয়েজের মতো বিদেশি হোস্টে মাসে ৪ থেকে ১২ ডলার। ক্রেতা সবাই দেশে হলে দেশি সার্ভার সামান্য এগিয়ে থাকে, তবে সাপোর্ট কেমন সেটা দামের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ — রাত দুইটায় সাইট বন্ধ হলে কে ফোন ধরবে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
থিম নিয়ে সবচেয়ে বেশি টাকা নষ্ট হয়। থিমফরেস্টে ৬০ ডলারের যে থিমে চল্লিশটা ডেমো আর দশটা বান্ডিল প্লাগইন আসে, ওটা কিনবেন না — ওগুলো সাইট ভারী করে, আপডেটে ভাঙে, আর দুই বছর পরে ডেভেলপার হাল ছেড়ে দিলে আপনি আটকে যান। Astra, GeneratePress বা Blocksy-র ফ্রি ভার্সন দিয়ে শুরু করুন; দরকার হলে পরে প্রো নেবেন। হালকা থিম মানে দ্রুত সাইট, আর দ্রুত সাইট মানে মোবাইল ডেটায় থাকা ক্রেতা চলে যাওয়ার আগেই পেজ খুলে যাওয়া।
সপ্তাহ ১ শেষ তখনই, যখন ডোমেইন কেনা হয়েছে, হোস্টিংয়ে SSL চালু আছে, আর ব্রাউজারে তালা চিহ্নটা দেখা যাচ্ছে। এর আগে পণ্য যোগ করা শুরু করবেন না।
সপ্তাহ ২ — ইনস্টল, আর প্লাগইনের বাজেট বেঁধে দেওয়া
ওয়ার্ডপ্রেস আর WooCommerce ইনস্টল করতে আধা ঘণ্টাও লাগবে না। সেটআপ উইজার্ডে দেশ বাংলাদেশ, মুদ্রা BDT, আর দাম দেখানোর ধরন ৳ চিহ্ন সামনে — এইটুকু ঠিক করে নিন। এবার সবচেয়ে জরুরি নিয়মটা নিজের জন্য লিখে রাখুন: প্লাগইনের সংখ্যা পনেরোর নিচে রাখবেন। প্রতিটা প্লাগইন একটা করে দরজা — নিরাপত্তার ঝুঁকি, গতির বোঝা, আর আপডেটের ঝামেলা। ফেসবুকের গ্রুপে যে ভাই বলেন পঁয়ত্রিশটা প্লাগইন লাগবে, তাঁর সাইটটা একবার খুলে গতি মেপে দেখবেন।
প্রথম মাসে যা যা সত্যিই লাগে: একটা ক্যাশিং প্লাগইন (হোস্টে লাইটস্পিড থাকলে LiteSpeed Cache ফ্রি, নইলে WP Rocket), একটা সিকিউরিটি প্লাগইন, একটা ব্যাকআপ প্লাগইন, ছবি অপ্টিমাইজ করার একটা টুল, আর একটা পেমেন্ট গেটওয়ে প্লাগইন। ব্যস। পপআপ, উইশলিস্ট, কারেন্সি সুইচার, লাইভ চ্যাট — এগুলো পরে, বিক্রি শুরু হওয়ার পরে, যদি সত্যিই দরকার পড়ে।
সপ্তাহ ৩ — পণ্য, আর ক্যাটালগের কাঠামো
এই সপ্তাহে ধৈর্য লাগবে, কারণ কাজটা একঘেয়ে অথচ এটাই দোকানের মেরুদণ্ড। প্রথমে ঠিক করুন কোনটা সিম্পল প্রোডাক্ট আর কোনটা ভ্যারিয়েবল। একটা শাড়ি যার একটাই রূপ — সিম্পল। একটা টি-শার্ট যার এম-এল-এক্সএল আর তিনটা রং আছে — ভ্যারিয়েবল, আর প্রতিটা কম্বিনেশনের আলাদা স্টক ও এসকেইউ থাকবে। এই জায়গায় গোলমাল করলে ছয় মাস পরে স্টক মেলে না, আর ক্রেতা এমন সাইজ অর্ডার করে ফেলে যেটা গুদামে নেই।
ক্যাটাগরি আর ট্যাগ গুলিয়ে ফেলবেন না। ক্যাটাগরি হলো তাক — পাঞ্জাবি, শাড়ি, বাচ্চাদের পোশাক; ক্রেতা এখান দিয়েই ঘোরে। ট্যাগ হলো বৈশিষ্ট্য — ঈদ কালেকশন, সুতি, হাতের কাজ। বারোটা ক্যাটাগরি বানিয়ে প্রতিটায় দুইটা পণ্য রাখার চেয়ে চারটা ক্যাটাগরিতে ষাটটা পণ্য অনেক ভালো কাজ করে।
- ছবি: বর্গাকার ১০০০x১০০০ পিক্সেল, প্রতিটা ফাইল ১৫০ কেবির নিচে, WebP ফরম্যাটে; ভারী ছবিই সাইট ধীর হওয়ার এক নম্বর কারণ
- বর্ণনা: কাপড়ের ধরন, মাপ, ধোয়ার নিয়ম, ডেলিভারিতে কত দিন — ক্রেতা যা ইনবক্সে জিজ্ঞেস করে, সেটাই লিখে দিন
- এসকেইউ: প্রথম দিন থেকেই দিন, নইলে দুইশ পণ্যের পরে হিসাব রাখা অসম্ভব হয়ে যায়
- প্রথমে মাত্র দশটা পণ্য তুলুন; পুরো ক্যাটালগ তোলার চেষ্টায় বহু দোকান লঞ্চের আগেই মরে যায়
সপ্তাহ ৪ — টাকা আর ডেলিভারি, অর্থাৎ আসল পরীক্ষা
এখানেই বাংলাদেশের গল্পটা আলাদা। পেমেন্ট গেটওয়ে নিতে হলে অ্যাগ্রিগেটর ধরতে হবে — SSLCommerz, aamarPay বা ShurjoPay; এরা একসাথে বিকাশ, নগদ, রকেট আর কার্ড দিয়ে দেয়। আবেদনের জন্য সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স, টিন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আর এনআইডি লাগে; অনুমোদনে কয়েক দিন থেকে দুই সপ্তাহ যেতে পারে, তাই এই কাজটা সপ্তাহ ২-এই শুরু করে দিন, নইলে লঞ্চ আটকে যাবে। লেনদেনের ফি সাধারণত ২ থেকে ৩ শতাংশের ঘরে থাকে, চ্যানেল আর দরকষাকষির ওপর নির্ভর করে — এই খরচটা পণ্যের দামে ধরে রাখুন, নইলে মার্জিন থেকে চুপচাপ কেটে যাবে।
কিন্তু সত্যি কথাটা হলো, এদেশে অর্ডারের বড় অংশ এখনো ক্যাশ অন ডেলিভারি। তাই COD-কে দ্বিতীয় সারির অপশন ভাববেন না, ওটাই আপনার প্রধান চেকআউট। আর COD মানেই ভুয়া অর্ডারের ঝুঁকি — কেউ মজা করে অর্ডার দিল, পার্সেল ঘুরে এল, কুরিয়ারের রিটার্ন চার্জ আপনার ঘাড়ে। সমাধান তিনটা, আর তিনটাই বাস্তবে কাজ করে: চেকআউটে ফোন নম্বর বাধ্যতামূলক করুন, নতুন ক্রেতার ক্ষেত্রে ওটিপি দিয়ে নম্বর যাচাই করুন, আর বেশি দামের পণ্যে ডেলিভারি চার্জটা আগাম নিন।
কুরিয়ার আর ডেলিভারি চার্জ বসান বাস্তব সংখ্যায়। স্টেডফাস্ট, প্যাথাও কুরিয়ার বা রেডএক্স-এ ঢাকার ভেতরে সাধারণত ৬০ থেকে ৮০ টাকা, ঢাকার বাইরে ১১০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে পড়ে, ওজন অনুযায়ী বাড়ে। WooCommerce-এর শিপিং জোনে দুইটা জোন বানান — ঢাকা সিটি আর সারা বাংলাদেশ — আর দুই জায়গায় দুই রকম ফ্ল্যাট রেট দিন। জেলা অনুযায়ী আলাদা রেটের জটিল ছক প্রথম দিনেই বানাতে যাবেন না; দুইটা জোন দিয়ে শুরু করে পরে বাড়ান।
সপ্তাহ ৫ — চেকআউট ছেঁটে ফেলা, পরীক্ষা, তারপর লঞ্চ
WooCommerce-এর ডিফল্ট চেকআউটে এমন সব ঘর থাকে যেগুলো এদেশে অর্থহীন — কোম্পানির নাম, দেশ, স্টেট, পোস্টকোড। প্রতিটা বাড়তি ঘর মানে মোবাইলে আরেকটা ট্যাপ, আর প্রতিটা ট্যাপে কিছু ক্রেতা ঝরে যায়। ঘরগুলো ছেঁটে নামিয়ে আনুন পাঁচটায়: নাম, ফোন, পুরো ঠিকানা, জেলা, আর পেমেন্ট পদ্ধতি। ইমেইলও বাধ্যতামূলক না রাখাই ভালো, কারণ বহু ক্রেতার ইমেইল নেই বা মনে থাকে না — যোগাযোগ যা হওয়ার ফোনেই হবে।
লঞ্চের আগে নিজের সাইটে অন্তত তিনটা আসল অর্ডার করুন — একটা COD-তে, একটা বিকাশে, একটা কার্ডে। ফোনের ছোট স্ক্রিনে করুন, ল্যাপটপে নয়, কারণ আপনার ক্রেতাদের নব্বই শতাংশ মোবাইলে আসবে। দেখুন অর্ডার কনফার্মেশনের এসএমএস বা ইমেইল যাচ্ছে কি না, অ্যাডমিন প্যানেলে অর্ডারটা ঠিকঠাক দেখাচ্ছে কি না, আর স্টক আপনাআপনি কমছে কি না। এই তিনটা পরীক্ষা যে দোকানগুলো এড়িয়ে যায়, তারা লঞ্চের দিন প্রথম আসল ক্রেতার টাকা হারায়।
যেগুলোতে প্রথম মাসে হাত দেবেন না
- মাল্টি-ভেন্ডর, মেম্বারশিপ বা সাবস্ক্রিপশন প্লাগইন — বিক্রি শুরুর আগেই মার্কেটপ্লেস বানানোর স্বপ্ন সবচেয়ে দামি ভুল
- জটিল ডিসকাউন্ট আর কুপনের নিয়ম; প্রথমে একটা সহজ ফ্ল্যাট ডিসকাউন্ট দিয়ে দেখুন কাজ হয় কি না
- পেইড থিম বান্ডিল আর লাইফটাইম ডিল; ফ্রি হালকা থিম দিয়ে প্রথম একশ অর্ডার হয়ে যায়
- কার্ট অ্যাবান্ডনমেন্ট ইমেইল অটোমেশন — কার্টই যখন খালি, তখন ওটা নিয়ে ভাবার কিছু নেই
প্রতি সপ্তাহে যে জিনিসটা চোখে দেখা যাবে
প্রতি সপ্তাহে একটা করে জিনিস চোখে দেখা যাচ্ছে কি না, সেটাই মাপকাঠি। প্রথম সপ্তাহে সাইট খোলে আর তালা দেখায়। দ্বিতীয় সপ্তাহে একটা খালি দোকান দাঁড়িয়ে আছে। তৃতীয় সপ্তাহে দশটা পণ্য আছে, ছবি দেখতে ভালো লাগছে। চতুর্থ সপ্তাহে আপনি নিজের কার্ডে একটা টেস্ট পেমেন্ট করে সেটা ড্যাশবোর্ডে দেখতে পেয়েছেন। পঞ্চম সপ্তাহে মোবাইল থেকে একটা অর্ডার করে কনফার্মেশন এসএমএস পেয়েছেন। মোবাইলে হোমপেজ তিন সেকেন্ডের ভেতর খুললে গতির দিকটাও ঠিক আছে ধরে নিন।
দোকান খোলার আগে যা জানতে চান সবাই
Shopify না WooCommerce? Shopify-তে সেটআপ সহজ, কিন্তু মাসে ২৯ ডলার থেকে শুরু, আর বিকাশ-নগদের দেশি গেটওয়ে বসানো ঝামেলার। WooCommerce-এ কাজ বেশি, কিন্তু গেটওয়ে আর কুরিয়ারের ইন্টিগ্রেশন এদেশে অনেক বেশি সহজলভ্য, আর মাসিক ফি নেই। ছোট দেশি দোকানের জন্য সাধারণত WooCommerce-ই যুক্তিসঙ্গত।
ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া দোকান চালু করা যাবে? সাইট চালু করা যাবে, COD-তে বিক্রিও করা যাবে। কিন্তু SSLCommerz বা aamarPay-র মতো গেটওয়ে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া অ্যাকাউন্ট দেয় না, ফলে অনলাইন পেমেন্ট বন্ধ থাকবে। ব্যবসা যদি সত্যি চালাতে চান, লাইসেন্সটা করিয়ে নিন — ইউনিয়ন বা সিটি করপোরেশনে খরচ খুব বেশি নয়।
পুরো সেটআপে খরচ কত? নিজে করলে প্রথম বছরে ডোমেইন, হোস্টিং আর টুকটাক মিলিয়ে আট থেকে পনেরো হাজার টাকার মধ্যে দাঁড়ায়। ডেভেলপারকে দিয়ে করালে ডিজাইন আর ইন্টিগ্রেশনের গভীরতা অনুযায়ী দাম বাড়ে। যেটা সবচেয়ে দামি, সেটা হলো ভুল হোস্টে বা ভুল থিমে বসে গিয়ে ছয় মাস পরে আবার শুরু করা।
সাইট ধীর হয়ে গেছে, কী করব? নব্বই ভাগ ক্ষেত্রে কারণ দুইটা — ভারী ছবি আর অপ্রয়োজনীয় প্লাগইন। আগে ছবিগুলো WebP-তে নামান, তারপর নিষ্ক্রিয় প্লাগইনগুলো ডিলিট করুন (শুধু বন্ধ করা নয়)। এতেও না হলে হোস্টিং আপগ্রেড করার সময় হয়েছে; সার্ভার দুর্বল থাকলে কোনো ক্যাশ প্লাগইন বাঁচাতে পারে না।
WooCommerce সেটআপের প্রযুক্তিগত অংশটুকু নিজে করা যায়, কিন্তু গেটওয়ে অনুমোদন, কুরিয়ার ইন্টিগ্রেশন আর COD-র ঝামেলা সামলাতে গিয়েই বেশিরভাগ দোকান আটকে যায়। এই জায়গাগুলো একবারে ঠিকঠাক বসিয়ে দিতে চাইলে স্ট্যাক অ্যালিক্সের সাথে কথা বলে দেখতে পারেন — আমরা দেশি পেমেন্ট আর ডেলিভারি বাস্তবতা মাথায় রেখেই দোকান দাঁড় করাই।

